আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির মঞ্চে রাশিয়া ইউক্রেন সংঘাত এখন এমন এক বিপজ্জনক সমীকরণে এসে দাঁড়িয়েছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপীয় নিরাপত্তাকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ২০২৬ সালের এই যুদ্ধ কেবল দুটি দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এখন বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ এবং ন্যাটোর সামরিক শক্তির পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। একদিকে ইউক্রেনের ড্রোন কৌশল রাশিয়ার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডে আঘাত হেনেছে, অন্যদিকে তার চরম প্রতিশোধ হিসেবে কিয়েভে রাশিয়ার হামলা ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ রাত তৈরি করেছে। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সবচেয়ে চমকপ্রদ অধ্যায় হলো বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের উলটপুরাণ—যে রাশিয়া বিশ্বকে তেল সরবরাহ করত, তারা এখন নিজেদের পাম্প সচল রাখতে ভারত থেকে তেল আমদানি করছে।
ইউক্রেনের ড্রোন কৌশল এবং রাশিয়ার নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট
বিগত কয়েক মাসে রাশিয়া ইউক্রেন সংঘাত এক সম্পূর্ণ নতুন রণকৌশল প্রত্যক্ষ করেছে। ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী এখন সরাসরি রাশিয়ার ‘ক্রিটিক্যাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ অর্থাৎ কৌশলগত অর্থনৈতিক পরিকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় আয়ের সিংহভাগ আসে তাদের তেল ও গ্যাস বিক্রির অর্থ থেকে। ইউক্রেন অত্যন্ত সস্তা কিন্তু নিখুঁত প্রযুক্তির ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়ার প্রধান প্রধান অয়েল রিফাইনারি (তেল শোধনাগার) এবং ফুয়েল ডিপোগুলোতে একের পর এক বিধ্বংসী হামলা চালিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের এই সুনির্দিষ্ট ড্রোন স্ট্রাইকের ফলে রাশিয়ার সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে। রাশিয়ার বিশাল ভূখণ্ডে বিস্তৃত মোট ১১টি টাইম জোনের প্রায় সবকটিতেই এখন তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, রাশিয়ার মূল শস্য উৎপাদনকারী অঞ্চলের কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, পর্যাপ্ত তেলের অভাবে তারা এবার ফসল কাটতে পারবেন না। ট্রাক্টর চালানো, সেচ পাম্প সচল রাখা এবং উৎপাদিত শস্য বাজারে নিয়ে যাওয়ার মতো দৈনিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি এখন রাশিয়াকে রেশনিং করতে হচ্ছে। রাশিয়ার পেট্রোল পাম্পগুলোতে সাধারণ মানুষের মাইলের পর মাইল দীর্ঘ লাইন এখন নিত্যদিনের দৃশ্য।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মূল উদ্দেশ্য হলো, রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ভ্লাদিমির পুতিনকে শান্তি আলোচনায় বসতে বাধ্য করা। কিছুদিন আগে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে ক্রেমলিনে একটি শান্তি প্রস্তাব পাঠানো হলেও পুতিন তা পুরোপুরি উপেক্ষা করেন। এর জবাবে ইউক্রেন তাদের হামলার তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং আগামী ৪০ দিনের মধ্যে রাশিয়ার জ্বালানি পরিকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার এক মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করে। Read more…
ভূরাজনীতির উলটপুরাণ: সংকট মেটাতে ভারত থেকে তেল আমদানি করছে রাশিয়া
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু থাকে না, থাকে কেবল স্থায়ী স্বার্থ—এই প্রবাদটিকেই বাস্তব প্রমাণ করল রাশিয়া ও ভারতের বর্তমান বাণিজ্য চুক্তি। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার কারণে তৈরি হওয়া অভ্যন্তরীণ তেলের ঘাটতি মেটাতে এখন খোদ রাশিয়াকেই ভারতের কাছ থেকে পরিশোধিত তেল (গ্যাসোলিন) আমদানি করতে হচ্ছে।
শিল্পক্ষেত্রের নির্ভরযোগ্য সূত্র মারফত জানা গেছে, ইতিমধ্যে সমুদ্রপথে ভারত থেকে প্রায় ৬০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ মেট্রিক টন গ্যাসোলিন রাশিয়ার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে। রাশিয়া তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ ঘাটতি সামাল দিতে বিভিন্ন মিত্র দেশ এবং বিশেষ করে ভারত থেকে মোট ৪,০০,০০০ টন গ্যাসোলিন আমদানির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করেছে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, রাশিয়া এই বিপুল পরিমাণ তেল কিনছে ভারতের গুজরাটে অবস্থিত ‘নিয়ারা এনার্জি’ (Nayara Energy) নামক একটি বিশাল রিফাইনারি থেকে। এই নিয়ারা এনার্জির প্রায় ৪৯.১৩% শেয়ারের মালিকানা রয়েছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা ‘রসনেফট’-এর (Rosneft) হাতে। অর্থাৎ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং নিজেদের পরিকাঠামো রক্ষা করতে রাশিয়াকে এখন তাদের নিজস্ব অংশীদারিত্ব থাকা ভারতীয় রিফাইনারি থেকেই চড়া দামে তেল কিনে দেশের পাম্পগুলো সচল রাখতে হচ্ছে। এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ ২০২৬-এ ক্রেমলিন সামরিকভাবে শক্তিশালী দাবি করলেও, অর্থনৈতিক ফ্রন্টে তারা কতটা বড় ধাক্কা খেয়েছে।
কিয়েভে রাশিয়ার ‘ভয়াবহতার রাত’: পুতিনের নির্মম পাল্টা আঘাত
ইউক্রেন হয়তো ভেবেছিল রাশিয়াকে জ্বালানি সংকটে ফেলে তারা পুতিনকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করতে পারবে, কিন্তু রাশিয়ার সামরিক প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ। ইউক্রেনের ড্রোন হামলার প্রতিশোধ নিতে রাশিয়া তার দূরপাল্লার মিসাইল এবং ড্রোন শক্তিকে পূর্ণ মাত্রায় ব্যবহার করেছে। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের ওপর রুশ বিমান বাহিনী যে হামলা চালিয়েছে, তাকে ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় “নাইট অফ হরর” বা ভয়াবহতার রাত বলে বর্ণনা করেছে।
মাত্র এক রাতের অভিযানে রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর ৭৪টি আধুনিক ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল এবং প্রায় ৪৯৬টি কামিকাজে ড্রোন দিয়ে একযোগে বোমাবর্ষণ করে। এই প্রলয়ঙ্কারী হামলায় কিয়েভের ৩০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই হামলায় অন্তত ২১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৯০ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। বহুতল আবাসিক ভবন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়, যার ফলে পুরো কিয়েভ শহর বিদ্যুৎহীন হয়ে অন্ধকারে ডুবে যায়।
এই বিধ্বংসী হামলার পর ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Air Defense System) সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জরুরি ভিত্তিতে আরও ‘প্যাট্রিয়ট মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম’ চেয়ে আবেদন করেছেন। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা (Industrial Capacity) এত দ্রুত বিপুল পরিমাণ আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি করার মতো অবস্থায় নেই। ফলে কিয়েভসহ পুরো ইউক্রেন এখন পুতিনের মিসাইল ও ড্রোনের সামনে প্রায় অরক্ষিত।
জেলেনস্কির রাজনৈতিক অবস্থান বনাম যুদ্ধক্ষেত্রের কঠিন বাস্তবতা
আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনা করছেন। জেলেনস্কি পেশাগত জীবনে একজন সাবেক কৌতুক অভিনেতা হওয়ায়, তিনি প্রায়শই আন্তর্জাতিক মঞ্চে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ বা ‘ট্রোল’ করে থাকেন। সম্প্রতি রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী ‘মে প্যারেড’ নিয়েও জেলেনস্কি অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন।
তবে যুদ্ধক্ষেত্রের আসল চিত্র অত্যন্ত নির্মম। বর্তমানে ইউক্রেনের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৮% থেকে ২০% অংশ রাশিয়ার সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ক্রিমিয়া ২০১৪ সালেই হাতছাড়া হয়েছে এবং ডনবাস অঞ্চলের একটি বিশাল অংশ পুতিনের বাহিনী সম্পূর্ণ গ্রাস করে নিয়েছে। দেশের এক-পঞ্চমাংশ এলাকা যখন শত্রুর দখলে এবং দেশের রাজধানী যখন জ্বলছে, তখন ইউক্রেনীয় প্রশাসনের এই ধরনের হালকা রাজনৈতিক আচরণ ও ট্রোলিং দেশের ভেতরে ও বাইরে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। যুদ্ধের ময়দান কেবল সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচারণায় বা পশ্চিমাদের দেওয়া ফাঁকা আশ্বাসে জেতা সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা।

পরবর্তী লক্ষ্য কি ন্যাটোর পোল্যান্ড? বিশ্বজুড়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা
কিয়েভ ধ্বংস করার পর রাশিয়ার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে, তা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এক মারাত্মক ও উদ্বেগজনক সতর্কবার্তা জারি করেছে। আমেরিকার আশঙ্কা, রাশিয়া এবার সরাসরি ন্যাটোর (NATO) সদস্য রাষ্ট্র পোল্যান্ডের মাটিতে একটি সশস্ত্র উস্কানি বা ‘আর্মড প্রোভোকেশন’ তৈরি করার পরিকল্পনা করছে।
এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো, ন্যাটোর যৌথ আত্মরক্ষা নীতি বা ‘আর্টিকেল ৫’ (Article 5)-এর কার্যকারিতা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সহ্যক্ষমতা পরীক্ষা করা। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের খবর, পোল্যান্ডের সীমান্ত অঞ্চলের ক্রিতিকাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা যোগাযোগ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে রাশিয়া ড্রোন হামলা চালাতে পারে অথবা রুশ সেনারা সাময়িকভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে পোল্যান্ডের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারে। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন যে, তারা সম্ভাব্য সব ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছেন।
এই পুরো সমীকরণে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো বেলারুশ। বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো পুতিনের অত্যন্ত বিশ্বস্ত মিত্র। বর্তমানে বেলারুশের মাটিতে প্রায় ৬৫,০০০ রুশ সেনা অবস্থান করছে, যারা নিয়মিত সামরিক মহড়া চালাচ্ছে। শুধু তাই নয়, বেলারুশে রাশিয়ার কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রও (Tactical Nuclear Weapons) মোতায়েন করা হয়েছে। পোল্যান্ডের একপাশে বেলারুশ এবং অন্যপাশে ইউক্রেন। ফলে পোল্যান্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন চরম হুমকির মুখে। পোল্যান্ডের ঠিক পরেই রয়েছে জার্মানি। রাশিয়া যদি পোল্যান্ডে কোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে তা সরাসরি ন্যাটো বনাম রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে রূপ নেবে, যা ডেকে আনতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
ভূরাজনৈতিক উপসংহার: কোন দিকে যাচ্ছে রাশিয়া ইউক্রেন সংঘাত?
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ ২০২৬ এখন আর কেবল দুটি দেশের সীমান্ত সংঘাত নয়, এটি বিশ্বব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করার এক বিপজ্জনক খেলায় পরিণত হয়েছে। ইউক্রেনের ড্রোন কৌশল রাশিয়াকে সাময়িক অর্থনৈতিক সংকটে ফেললেও, রাশিয়ার পাল্টা আঘাত হানার ক্ষমতা এবং পুতিনের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধনীতি এখনো অক্ষুণ্ণ। ভারত থেকে রাশিয়ার তেল আমদানির ঘটনাটি যেমন বৈশ্বিক বাণিজ্যের নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে, তেমনি পোল্যান্ড সীমান্তে রাশিয়ার নজর পুরো পশ্চিমা বিশ্বকে আতঙ্কের মধ্যে রেখেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন এবং ন্যাটোর পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে এই সংঘাত ইউরোপের সীমানা ছাড়িয়ে পুরো বিশ্বে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে কি না।