পরিবেশ দূষণ রোধ এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ কার্বন-মুক্ত করার লক্ষ্যে এক অভূতপূর্ব মাইলফলক স্পর্শ করল ভারতীয় রেল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে হরিয়ানার জিন্দ-সোনিপথ রেল সেকশনে সফলভাবে সম্পন্ন হলো ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন-এর চূড়ান্ত হাই-স্পিড ট্রায়াল রান। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই পরিবেশবান্ধব ট্রেনটি ট্রায়াল রানের সময় সর্বোচ্চ ১২০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিবেগ স্পর্শ করেছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের ‘নেট-জিরো কার্বন এমিশন ২০৩০’ (Net-Zero Carbon Emission 2030) লক্ষ্যের দিকে এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। জার্মানি এবং চীনের মতো হাতে গোনা কয়েকটি দেশের এলিট ক্লাবে এবার নাম লেখাল ভারতও।
হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তি: কীভাবে চলে এই ট্রেন?
সাধারণ ডিজেল চালিত ইঞ্জিনের মতো এই ট্রেনে কোনো ক্ষতিকারক ধোঁয়া বা বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয় না। ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন মূলত চলে উন্নত হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল (Hydrogen Fuel Cell Technology) প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে।
- রাসায়নিক বিক্রিয়া: ট্রেনের ছাদে বসানো বিশেষ হাইড্রোজেন ট্যাঙ্ক থেকে হাইড্রোজেন গ্যাস এবং বায়ুমণ্ডল থেকে সংগৃহীত অক্সিজেন গ্যাসের মধ্যে একটি ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল বিক্রিয়া ঘটানো হয়।
- বিদ্যুৎ উৎপাদন: এই রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ বা ইলেকট্রিসিটি উৎপন্ন হয়, যা ট্রেনের ট্র্যাকশন মোটরকে সচল করে।
- উপজাত উপাদান (By-product): সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো ক্ষতিকারক উপজাত তৈরি হয় না। সাইলেন্সার দিয়ে ধোঁয়ার পরিবর্তে শুধুমাত্র বিশুদ্ধ জলীয় বাষ্প (Water Vapour) এবং সামান্য তাপ নির্গত হয়।
জিন্দ-সোনিপথ রুট: প্রথম পাইলট প্রজেক্টের বিস্তারিত
উত্তর রেলওয়ের (Northern Railway) অধীনে থাকা হরিয়ানার জিন্দ-সোনিপথ রুট (Jind-Sonipat Route)-কে এই ঐতিহাসিক প্রকল্পের পাইলট রুট হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
১. হাইড্রোজেন উৎপাদন ও রিফুয়েলিং স্টেশন
এই ট্রেনের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য জিন্দ রেলওয়ে স্টেশনে একটি সম্পূর্ণ ডেডিকেটেড গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদন এবং রিফুয়েলিং ফ্যাসিলিটি বা প্ল্যান্ট তৈরি করা হয়েছে। এখানে সৌর বা বায়ু শক্তির মতো নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে জল থেকে ইলেকট্রোলাইসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৪৩০ কেজি বিশুদ্ধ হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব।
২. ট্রেনের ধারণক্ষমতা ও ইঞ্জিন পাওয়ার
ভারতীয় রেলের অনুমোদিত এই ট্রেনটি একটি ১০-কোচ বিশিষ্ট ব্রড-গেজ ট্রেনসেট (10-Coach Broad Gauge Trainset)। এতে ১২০০ কিলোওয়াটের দুটি ড্রাইভিং পাওয়ার কার (DPC) রয়েছে, যার সম্মিলিত ক্ষমতা ২৪০০ কিলোওয়াট। সাধারণ যাত্রী পরিবহনের সময় এটি গড়ে ৭৫ কিমি প্রতি ঘণ্টা গতিবেগে যাতায়াত করবে।

সুরক্ষার দিক থেকে কতটা নিরাপদ এই হাইড্রোজেন ট্রেন?
হাইড্রোজেন গ্যাস অত্যন্ত দাহ্য হওয়ায় ভারতীয় রেল এই ট্রেনের সুরক্ষার বিষয়ে কোনো আপস করেনি। ট্রেনটিতে রয়েছে বহুস্তরের আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা:
- হাইড্রোজেন লিক ডিটেক্টর: ট্রেনের কোথাও সামান্যতম গ্যাস লিক হলে স্বয়ংক্রিয় সেন্সর তা সাথে সাথে ধরে ফেলবে।
- ফ্লেম ডিটেকশন ইক্যুইপমেন্ট: অগ্নিকাণ্ডের মতো পরিস্থিতি এড়াতে এতে চব্বিশ ঘণ্টা সচল ফ্লেম সেন্সর লাগানো রয়েছে।
- ২৪/৭ রিয়েল-টাইম মনিটরিং: দিল্লির শকুরবস্তি রেল ডিপোতে এই ট্রেনের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিশেষ স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) তৈরি করা হয়েছে, যেখান থেকে ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল নজরদারি চালানো হবে।
ভারতীয় অর্থনীতি ও রেলের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
বর্তমানে ভারতীয় রেলে হাজার হাজার ডিজেল ইঞ্জিন সচল রয়েছে, যা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের জন্য দায়ী। হাইড্রোজেন ট্রেন চালু হওয়ার ফলে পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর যে ব্যাপক প্রভাব পড়বে, তা নিচে আলোচনা করা হলো:
| বৈশিষ্ট্যের তুলনা | ঐতিহ্যবাহী ডিজেল ট্রেন | আধুনিক হাইড্রোজেন ট্রেন |
| জ্বালানির উৎস | খনিজ তেল (ডিজেল) | গ্রিন হাইড্রোজেন গ্যাস |
| পরিবেশের ওপর প্রভাব | উচ্চ কার্বন নির্গমন ও বায়ু দূষণ | শূন্য কার্বন এমিশন (শুধু জলীয় বাষ্প) |
| শব্দ দূষণের মাত্রা | অত্যন্ত বেশি | অত্যন্ত কম এবং শান্ত চলাচল |
| অর্থনৈতিক নির্ভরতা | আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরশীল | সম্পূর্ণ দেশীয় ও আত্মনির্ভর প্রযুক্তি |
এই ট্রেনের বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হলে ভারত প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারবে, যা আগে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে খরচ হতো।
সবুজ ভবিষ্যতের দিকে ভারতের দূরদর্শী পদক্ষেপ
রেলওয়ে বোর্ডের সবুজ সংকেত এবং ১২০ কিমি গতিবেগের সফল ট্রায়ালের পর এটি স্পষ্ট যে, ভারতের গণপরিবহনের ভবিষ্যৎ হতে চলেছে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগের হাত ধরে তৈরি এই হাইড্রোজেন ট্রেন ভারতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যদিও এর চূড়ান্ত কমার্শিয়াল উদ্বোধনের দিনক্ষণ খুব শীঘ্রই ঘোষণা করা হবে, তবে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে— সবুজ এবং দূষণমুক্ত ভারতের স্বপ্ন পূরণের ট্রেনটি ইতিমধ্যেই স্টেশন ছেড়ে এগিয়ে চলেছে।
Wow. Great works by our scientist
Nice article
thanks