রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ২০২৬: জেলেনস্কির ৪০ দিনের বিশেষ অপারেশন এবং বিশ্ব রাজনীতির নতুন মোড়

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ (Russia-Ukraine War) আজ এক নতুন ও অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত কমার কোনো লক্ষণ তো নেই-ই, বরং সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তা আরও তীব্র ও বহুমুখী রূপ ধারণ করেছে। ইউক্রেনীয় বাহিনীর নজিরবিহীন ড্রোন হামলা (Drone Attack) এবং বেলারুস সীমান্তে রাশিয়ার বিপুল সেনা মোতায়েন বিশ্ববাসীকে এক চরম পারমাণবিক ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

ইউক্রেনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি (Volodymyr Zelensky) হঠাৎ করেই এক ‘৪০ দিনের ইনফ্লুয়েন্স অপারেশন’ (40-Day Influence Operation) বা প্রভাব বিস্তারের কৌশলগত অভিযান শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণার পর থেকেই বিশ্ব রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এই ইনফ্লুয়েন্স অপারেশন আসলে কী এবং এর পেছনে জেলেনস্কির আসল উদ্দেশ্যই বা কী? একই সাথে, এই যুদ্ধে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin)-এর পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)-এর আমেরিকান নীতির কী প্রভাব পড়তে চলেছে—আসুন তা বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

জেলেনস্কির ৪০ দিনের ইনফ্লুয়েন্স অপারেশন এবং ড্রোন হামলার রেকর্ড

সাধারণত সামরিক পরিভাষায় ‘ইনফ্লুয়েন্স অপারেশন’ বলতে তথ্য যুদ্ধ (Information Warfare), গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নিজেদের পক্ষে একটি শক্তিশালী ন্যারেটিভ বা প্রচার তৈরি করাকে বোঝায়। তবে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বর্তমান স্ট্র্যাটেজি বা কৌশলটি শুধু কথার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরাসরি রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার একটি ভয়াবহ রূপ।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত মে মাসে ইউক্রেন রাশিয়ার ওপর ৫৫৬ টি ড্রোন হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু এবার জেলেনস্কি নিজের সেই রেকর্ড ভেঙে রাশিয়ার অভ্যন্তরে ৬৬০টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছেন। যদিও রাশিয়ার উন্নত এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এর একটি বড় অংশ আকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে, তা সত্ত্বেও বহু ড্রোন রাশিয়ার অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত অবকাঠামোতে (Critical & Strategic Infrastructure) আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।

ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো মূলত রাশিয়ার বড় বড় অয়েল রিফাইনারি বা তেল শোধনাগারগুলোকে নিশানা করছে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং কিছু কিছু অঞ্চলে রাশিয়াকে তেল আমদানি করার কথাও ভাবতে হচ্ছে। আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলো যখন ইউক্রেনকে দূরপাল্লার মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ওপর নানা আইনি নিষেধাজ্ঞা বা বাধানো নিষেধ দিয়ে রেখেছে, তখন জেলেনস্কি নিজের তৈরি করা দেশীয় ড্রোন প্রযুক্তির কৌশল ব্যবহার করে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ, ক্রিমিয়া এবং মস্কোর মতো হাই-প্রোফাইল শহরগুলোতে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছেন।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ২০২৬
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ২০২৬

যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান স্থবিরতা ও ক্রেমলিনের পারমাণবিক হুঁশিয়ারি

১,০০০ থেকে ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত জুড়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যে সম্মুখ যুদ্ধ চলছে, তা বর্তমানে এক ধরণের ‘স্টেলমেট’ বা স্থবিরতার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়া শুরুতে ইউক্রেনের প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ অঞ্চল দখল করতে পারলেও, গত কয়েক মাসে পুতিনের বাহিনী নতুন কোনো বড় সাফল্য বা ভূখণ্ড নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি। অন্যদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার দখলকৃত এলাকা পুরোপুরি মুক্ত করতে পারছে না।

এই চরম স্থবিরতার কারণে রাশিয়ার ভেতরে এবং ক্রেমলিনের কট্টরপন্থী সিনিয়র নেতাদের মধ্যে প্রচণ্ড হতাশা ও ক্ষোভ (Frustration) তৈরি হচ্ছে। রাশিয়ার কিছু কিছু সিনিয়র নীতিনির্ধারক ও সামরিক বিশেষজ্ঞ এখন এতটা মরিয়া হয়ে উঠেছেন যে, তাঁরা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ‘স্কর্চড আর্থ পলিসি’ (Scorched Earth Policy—যেখানে শত্রুর সুবিধার্থে সমস্ত সম্পদ পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়) এমনকি সীমিত পরিসরে ‘ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্র’ (Tactical Nuclear Weapons) ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত পুতিনের জন্য আত্মঘাতী হবে এবং এর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া সামলানো রাশিয়ার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বেলারুস ফ্যাক্টর: রাশিয়ার নতুন যুদ্ধক্ষেত্র খোলার প্রস্তুতি?

ইউক্রেনের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘বেলারুস ফ্যাক্টর’ (Belarus Factor)। বেলারুসের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো হলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র। রাশিয়া ইতিমধ্যেই বেলারুসের মাটিতে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করে রেখেছে।

সাম্প্রতিক গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, রাশিয়া বেলারুস সীমান্তে প্রায় ৭টি সামরিক ডিভিশন বা বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন করেছে। যদিও মস্কো এটিকে একটি সাধারণ সামরিক মহড়া বলে দাবি করছে, কিন্তু যুদ্ধের মাঝখানে এত বিপুল সেনা সমাবেশ অন্য কিছুর ইঙ্গিত দেয়। ইউক্রেনের রাজধানী কিইভ (Kyiv) থেকে বেলারুসের দূরত্ব অত্যন্ত কম। পুতিন যদি বেলারুসকে ব্যবহার করে উত্তর দিক থেকে কিইভ-এর দিকে দ্বিতীয় একটি ফ্রন্ট বা নতুন যুদ্ধক্ষেত্র খুলে দেন, তবে ইউক্রেনের পক্ষে দুই দিক থেকে আসা রাশিয়ান ও বেলারুশিয়ান যৌথ বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ ইউক্রেনের কাছে বর্তমানে একসাথে দুটি ফ্রন্টে লড়াই করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ, অস্ত্র কিংবা জনবল নেই।

আসল খলনায়ক কি চীন? রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আসল ভূ-রাজনীতি

এই যুদ্ধের নেপথ্যের সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক সত্যটি হলো, আমেরিকার প্রকৃত জাতীয় নিরাপত্তা নথিপত্র এবং গোয়েন্দা রিপোর্টগুলো বলছে যে, আমেরিকার আসল শত্রু বা বৈশ্বিক হুমকি রাশিয়া কিংবা ইরান নয়—আসল থ্রেট বা হুমকি হলো চীন (China)।

চীন-আমেরিকা দ্বন্দ্ব (US-China Conflict) ও বিশ্বজুড়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের এই লড়াইয়ে চীন চাইছে আমেরিকা যেন ইউক্রেন এবং ইরানের মতো regional বা আঞ্চলিক যুদ্ধগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে ফেঁসে থাকে। আমেরিকা যত বেশি এসবে জড়িয়ে থাকবে, তাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার নষ্ট হবে এবং বিশ্বমঞ্চে তারা তত বেশি দুর্বল ও অপমানিত হবে। বেইজিং পরোক্ষভাবে ইরান ও রাশিয়াকে সাহায্য করে এই যুদ্ধকে জিইয়ে রাখছে, যাতে আমেরিকার পুরো মনোযোগ এশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং চীনের দিক থেকে সরে থাকে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) এবং মার্কিন থিংক-ট্যাংকগুলো এখন বুঝতে পারছে যে, চীনের এই ক্রমবর্ধমান উত্থান রুখতে হলে আমেরিকাকে সবার আগে ইউক্রেন এবং ইরানের অধ্যায় দ্রুত শেষ করতে হবে। ট্রাম্প আগামীতে মার্কিন নীতিতে পরিবর্তন এনে পুতিনের সাথে সরাসরি আলোচনায় বসতে পারেন, যার ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে।

উপসংহার

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ (Russia-Ukraine War) এখন আর কেবল দুটি দেশের সীমানার লড়াই নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির এক মহা দাবার চাল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালের শেষের দিকে এই যুদ্ধের অবসান ঘটতে পারে। বর্তমানে যে ড্রোন হামলা এবং সহিংসতার আকস্মিক বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা মূলত নিভে যাওয়ার আগে প্রদীপের শেষবারের মতো জ্বলে ওঠার মতো ঘটনা। জেলেনস্কির এই ৪০ দিনের ইনফ্লুয়েন্স অপারেশন এবং রাশিয়ার বেলারুস চাল হয়তো এই যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করবে। শেষ পর্যন্ত বিশ্বশান্তির স্বার্থে এবং চীনের আধিপত্য রুখতে আমেরিকাকে এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতেই হবে।

3 thoughts on “রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ২০২৬: জেলেনস্কির ৪০ দিনের বিশেষ অপারেশন এবং বিশ্ব রাজনীতির নতুন মোড়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *