ভারতের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী এবং স্পর্শকাতর প্রতিরক্ষা প্রজেক্ট AMCA (Advanced Medium Combat Aircraft) এই মুহূর্তে বড়সড় আলোচনার কেন্দ্রে। ভারতের এই পঞ্চম প্রজন্মের (5th Generation) স্টিলথ ফাইটার জেটের প্রাথমিক সংস্করণের জন্য মার্কিন সংস্থা জেনারেল ইলেকট্রিক (GE)-এর GE F414 ইঞ্জিন ব্যবহারের কথা রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু মিডিয়া রিপোর্টে দাবি করা হচ্ছে, আমেরিকার এই ইঞ্জিন সরবরাহ বিলম্ব এবং অত্যাধিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রজেক্টটি কিছুটা ধাক্কা খেতে পারে। তবে এর মধ্যেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অভ্যন্তরীণ সূত্রে ভিন্ন খবরও সামনে আসছে।
কেন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই AMCA প্রজেক্ট?
ভারতীয় বিমানবাহিনীর (IAF) শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (DRDO) এবং হ্যাল (HAL) যৌথভাবে এই AMCA Fighter Jet তৈরি করছে। এটি এমন একটি যুদ্ধবিমান যা রাডারকে ফাঁকি দিতে সক্ষম (Stealth Technology)। বর্তমানে প্রতিবেশী চীন যেখানে ক্রমাগত তাদের J-20 স্টিলথ ফাইটার জেটের সংখ্যা বাড়াচ্ছে এবং পাকিস্তান চীনের থেকে J-35 ফাইটার জেট কেনার পরিকল্পনা করছে, সেখানে ভারতের জন্য নিজস্ব প্রযুক্তির AMCA অত্যন্ত জরুরি।
সমস্যার কেন্দ্রে কি শুধুই GE F414 ইঞ্জিনের মূল্যবৃদ্ধি?
গত কয়েকদিনে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল যে, GE Aerospace তাদের তৈরি GE F414 Engine-এর দাম আগের অনুমানের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পূর্বে যেখানে প্রতিটি ইঞ্জিনের দাম ৭০-৮০ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল, সেখানে নতুন দরদাম নিয়ে আলোচনা থমকে গেছে বলে খবর রটে।
এছাড়া আমেরিকার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন লাইনের সমস্যার কারণে তেজাস (Tejas Mk1A) বিমানের জন্য প্রয়োজনীয় F404 ইঞ্জিন আসাতেও দেরি হচ্ছিল, যার প্রভাব AMCA প্রজেক্টের ওপর পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়।
প্রতিরক্ষা সূত্রের দাবি: তবে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর মতো নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের একটি সূত্র জানিয়েছে যে এই আলোচনা সম্পূর্ণ ভেস্তে যাওয়ার বা ডেডলক (Deadlock) তৈরি হওয়ার খবরটি সঠিক নয়। টেকনিক্যাল আলোচনা শেষ হয়েছে এবং কমার্শিয়াল তথা প্রযুক্তি হস্তান্তর (Technology Transfer) সংক্রান্ত চুক্তি নিয়ে অত্যন্ত জটিল ও সুক্ষ্ম আলোচনা এখনও চলছে।
ব্যাকআপ প্ল্যান: ইউরোপের দিকে ঝুঁকছে ভারত?
আমেরিকার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না থেকে ভারত ইতিমধ্যেই বিকল্প পথ বা ‘প্ল্যান বি’ (Plan B) নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করেছে। বিশেষ করে AMCA Mk2 (পরবর্তী সংস্করণ)-এর জন্য আরও শক্তিশালী ১১০ কিলোনিউটন (kN) থ্রাস্টের ইঞ্জিনের প্রয়োজন হবে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ভারত এই ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তরের (ToT) মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিজস্ব দেশীয় ইঞ্জিন তৈরির জন্য দুটি বড় বৈশ্বিক সংস্থার সাথে আলোচনা চালাচ্ছে:
- Safran (ফ্রান্স): রাফাল ফাইটার জেটের ইঞ্জিন প্রস্তুতকারক এই সংস্থা ভারতকে ১০০% প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রস্তাব দিচ্ছে।
- Rolls-Royce (যুক্তরাজ্য): ব্রিটিশ এই সংস্থাও ভারতের সাথে যৌথভাবে কো-ডেভেলপমেন্ট (Co-development) বা যৌথ উৎপাদনে আগ্রহী। The New Indian Express
আগামী দিনে ভারতের ভবিষ্যৎ কী?
যদিও আমেরিকার ইঞ্জিন ডেলিভারি কিছুটা ধীরগতির, তা সত্ত্বেও হ্যাল (HAL) এবং ডিআরডিও আশা করছে ২০২৬ সালের শেষের দিকে ইঞ্জিনের জট অনেকটাই কেটে যাবে। AMCA-এর প্রথম পাঁচটি প্রোটোটাইপ (Prototype) তৈরির জন্য ১৫টি GE F414 ইঞ্জিন ব্যবহার করা হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ভারত যাতে ফাইটার জেট ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ‘আত্মনির্ভর’ (Aatmanirbhar) হতে পারে, সেটাই এখন মোদী সরকারের মূল লক্ষ্য।